সুযোগ করে বোর হন

প্রচন্ড কাজের চাপ, পরিবারের দ্বায়িত্ব, বাজার সদাই, কোনোদিকে যাবার প্লান সবকিছুর মধ্যে হঠাৎ একদিন  দেখা যায় আর একটা কিচ্ছু করতে ইচ্ছা করছে না৷  একই প্যাটার্নের ব্যস্ত জীবন কাটাতে কাটাতে নিজের কাছেই মনে হয় আসলে এসব কেন করছি? জীবনের আসলে উদ্দেশ্যটা কি? মানে কোথায়? মানুষের জীবনকে সচল রাখতে প্রয়োজন হয় জ্বালানির। জ্বালানি বলতে কাঠ, কয়লার কথা বলছি না। বলছি জীবনের একটা উদ্দেশ্য থাকা, একটা অর্থ থাকা। সে জ্বালানি হঠাৎ করে ফুরিয়ে আসতে থাকলেই শুরু হয় একঘেয়েমি অনুভূতি। 

আপনিও নিশ্চয়ই একঘেয়েমি কমানোর জন্যই আমার এই ভিডিওতে ক্লিক করেছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন শুধু আমি, আপনি না। এই বিরক্তি ভাব, একঘেয়ে লাগার সমস্যাটা এখন সবার৷ অথচ এখন ফেইসবুক রিলস বলেন বা ইউটিউব কিংবা ইন্সটাগ্রাম কন্টেন্ট কোনোটারই অভাব নেই। আমরা আছি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কন্টেন্ট যুগে। যেখানে মানুষের কাছে বিনোদনের অপশনের অভাব নেই। তবুও মানুষ এখন আগের থেকেও বেশি বোর ফিল করছে। এটা কোনো ছোট বা ফেলনা ব্যাপার না। এটা আমাদের অজান্তেই আমাদের জীবনের আসল উদ্দেশ্য, অর্থ সব নষ্ট করে দিচ্ছে। এক পর্যায়ে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে জীবন থেকেও। 

 আমাদের ব্রেন আসলে বোর কেন হয়? এই বিরক্তি বা একঘেয়ে লাগাটা আসলে ব্রেনের একটা বায়োলজিক্যাল সিগন্যাল যেটা আমাদের ব্রেইন বহু আগেই আবিষ্কার করেছিল। আমাদের যখন একঘেয়ে লাগে ব্রেনের বিভিন্ন পার্টগুলো একসাথে হয়ে আমাদের বলে আমরা এখন যা করছি সেটার পরিবর্তন হওয়া দরকার। ধরুন আপনি টানা পড়াশোনা করছেন বা টানা কোন কাজ করতে করতে বিরক্ত হয়ে গেছেন আপনার ব্রেনের বিভিন্ন পার্টগুলো তখন একত্রিত হয়ে আপনাকে বলবে অনেক হয়েছে ভাই। এবার একটু অন্যকিছু কর। 

এটা তো গেল এই যুগের কথা। এবার চিন্তা করে দেখুন তো, ৫০০ বছর আগেও কি মানুষের মধ্যে এই অনুভূতি ছিল? 

ধরুন ৫০০ বছর আগের সময়ে আছি আমরা। আপনি একজন কৃষক। যার ধ্যান জ্ঞানই হল জমিতে শাক সবজি ফলানো। কারণ আপনি যদি এটা না করেন আপনি আর আপনার ফ্যামিলি না খেয়ে মরবেন৷ তাই এই কাজ আপনার চিন্তার অনেক্টুকু জায়গা জুড়ে আছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে এইখানে আপনার কাজ করার পেছনে যে মানসিক শক্তি কাজ করছে তার জ্বালানি হচ্ছে খাবারের চাহিদা, পরিবারের বেচে থাকা। এটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে আপনার মাথায় আর অন্য কোনো চিন্তা জায়গাই পাচ্ছে না। কারণ এটাই আপনি বংশ পরম্পরায় করে আসতে দেখেছেন,  এটার মধ্যেই জীবনের মানে খুজে পাচ্ছেন। একঘেয়েমির সুযোগই নেই। 

তারমানে এই না যে আগের যুগে মানুষের একঘেয়ে লাগত না। আগের যুগেও মানুষের একঘেয়েমি  লাগত। কিন্তু এই একঘেয়ে বা বোর কথাটার আবিষ্কারই তখন হয় নি। একঘেয়েমি লাগার সুযোগটাও ছিল শুধুমাত্র  আভিজাত শ্রেণির মানুষের যেমন রাজদরবারের মন্ত্রী বা সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তি কিংবা পাদ্রী বা যাজকদের মত গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের। কারণ তাদের হাতে সময় ছিল। আবার সন্ন্যাসীদের হাতেও সাধারণ মানুষ থেকে বেশি সময় থাকত৷ তারাই প্রথম এই একঘেয়েমি অনুভূতিটির একটা নাম দেয়, একেডিয়া। সন্ন্যাসীদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য থাকে সৃষ্টিকর্তার প্রতি দ্বায়িত্ব। সে দ্বায়িত্ব পালনে যখন মাঝেমধ্যে তাদের একঘেয়েমি লাগতে থাকল তখন তারা এই অনুভূতি আবিষ্কার করল। অন্যদিকে খ্রীষ্টানদের মতে এই একঘেয়েমি লাগাটা ছিল ভয়ংকর একটা পাপ কারণ তাদের ধারণা ছিল এই পাপ সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসও ধ্বংস করে দিতে পারে। তারা এটার নাম দিল দুপুর বেলার শয়তান। যে শয়তান সব শয়তান থেকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। তাদের মতে একঘেয়েমি থেকেই শুরু হয় অন্যান্য আরো পাপ কাজ। পরবর্তীতে ফ্রেঞ্চ সন্ন্যাসীরা এই সংগাকে আরেক ধাপ পরিবর্তন করে বলল যখন মানুষের নিজের বর্তমান অবস্থা থেকে পালাতে ইচ্ছা করে, একই রুটিনের জীবনে ক্লান্ত লাগতে থাকে সেটার নামই হল একঘেয়েমি। ঠিক তারপরে ১৭০০ সালের দিকে প্রথম বিভিন্ন জায়গায় বোর শব্দটা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। একঘেয়েমি ততদিনে অভিজাত শ্রেণি থেকে সব ধরনের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। 

বর্তমানে মানুষ এই একঘেয়েমির আল্টিমেট সমাধান খুজে নিয়েছে মোবাইল ফোনে। ট্রেন আসতে লেইট হচ্ছে?  স্টেশনে দাঁড়িয়ে ফোন টেপা শুরু করে দেই আমরা। কোথাও অপেক্ষা করার সময় একঘেয়েমি কাটাতে প্রথম উপায়টাই মাথায় আসে ফোন চালানো। এর মানে আপনি কখনো আপনার নিজের কম্ফোর্টেবল জোন থেকে বের হয়ে ক্রিয়েটিভ কিছু করার সুযোগই পাচ্ছেন না। গবেষণায় দেখা গেছে যে একঘেয়েমি কাটাতে আপনি  ঘন্টার পর ঘন্টা সোশ্যাল মিডিয়াতে স্ক্রলিং করছেন সেটা আপনার একঘেয়েমি তো কাটাচ্ছেই না উলটো আপনার ডিপ্রেশন, বিরক্তি আরও বাড়াচ্ছে। যেমন ধরুন আপনার ক্ষুদা লাগল। তখন যদি আপনি ভাত বা রুটির মত খাবার না খেয়ে হাতের কাছে থাকা চিপস খান তাহলে হয়ত সাময়িক সময়ের জন্য ক্ষুদা মিটবে। কিন্তু একটু পরেই খালি পেটে চিপস খাওয়ার জন্য আপনার ক্ষুদাটা আরও তীব্র হবে। একঘেয়েমিটাও ঠিক তেমন। 

গবেষণায় দেখা গেছে একঘেয়েমি আপনাকে তিনটা দিকে ঠেলে দিতে পারে। 

প্রথমত একদম সাধারণ মানুষজন একঘেয়েমি কাটাতে সাধারণত সেডিজমের পথ বেছে নেয়। “সেডিজম”। অর্থাৎ নিজের আনন্দের জন্য অন্যের ক্ষতি করা। বেশিরভাগ মানুষ একঘেয়েমি কাটাতে জ্বালানি হিসেবে অন্যের ক্ষতি করার মধ্য দিয়েই নিজের আনন্দ খুজে নেয়। ফ্যামেলির উপর রাগ ঝাড়া, অনলাইনে মানুষকে কুটুক্তি করা, পার্টনারের সাথে ঝগড়া করা ইত্যাদি। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই নেগেটিভ জিনিসগুলা কিন্তু ঠিকই আমাদের একঘেয়েমি কাটায়। তবে নেগেটিভ এনার্জি সাময়িকভাবে আমাদের ব্রেইনকে একটা উদ্দেশ্য খুজে দিলেও পরবর্তীতে মারাত্মক ক্ষতি করে। আবার অনেকে এ সময়ে নিজেকেই আঘাত করে যেন একঘেয়েমি থেকে আসা মানসিক অশান্তি থেকে বাচতে পারে। চিন্তা করে দেখুন,  খ্রিস্টান পাদ্রিরা একঘেয়েমি লাগাটাকে শয়তানের চাল বলে তাহলে ভুল করে নি।  

আচ্ছা এতক্ষণ একঘেয়েমির ডার্ক সাইডটা বললাম। এখন ভালো দিকটাও বলি। একঘেয়েমি কাটাতে অনেকে সহজে নেগেটিভ কাজ না করে নিজের মনের উপর একটু জোর খাটায় ভালো কাজের দিকে যেতে পারে। ধরুন একটু সবুজ প্রকৃতির মধ্যে বাইরের হেটে আসা বা এক্সারসাইজ করা, বাসায় থাকলে পরিবারের সাথে গল্প করা৷  এসব কিছুই আমাদের জীবনের গাড়ি চলার জন্য নতুন করে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। তবে এইসব কাজে  থাকে পজিটিভ এনার্জি।  

আরেকটা পথ আছে। যেটা খুবই কমন।  মোবাইলে স্ক্রলিং করা। যদিও এটা আপনার জীবনের কোনো অর্থ এনে দিবে না,  জীবনেরও উদ্দেশ্য খুজে দিবে না। কিন্তু মোটামুটি আপনার একঘেয়েমির অনুভূতিটা জোর করে ভোতা করে দেয়। 

সমস্যার কথা তো গেল এখন আসি আসল প্রসঙ্গে। কিভাবে আপনি আপনার একঘেয়েমিকে ম্যানেজ করবেন। প্রথম পদ্ধতিটা হচ্ছে খেয়াল করা।  নেক্সটাইম যখন আপনি বোর হবেন তখন মোবাইল নিয়ে আপনার বিরক্তি  কাটানোর আগে বুঝতে হবে আপনার একঘেয়েমিটা আসলে কেমন। আপনি দেখবেন আপনার ব্রেন অতীত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক কিছু ভাবছে। আপনি ব্রেইনকে ভাবতে দিবেন, নিজের একঘেয়েমিকে চিনবেন। এটাকে বলে মাইন্ডফুলনেস। অনেক মানসিক চিকিৎসাতেই এই টার্মটা ব্যবহার করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি আসলে  একঘেয়েমি কাটাতেই এই টার্ম ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত একঘেয়েমি লাগলে খেয়াল করবেন আমাদের ভেতর এক ধরনের অশান্তি তৈরি হয়। তাই একঘেয়েমি লাগলে মনটাকে রিলাক্স করার চেষ্টা করতে হবে। 

এখন আসি বৈজ্ঞানিক গবেষণা মতে প্রমাণিত কিছু টার্মে। বিজ্ঞান বলে একঘেয়েমি কাটাতে চাইলে আপনাকে হতে হবে  প্রসোশ্যাল। সিম্পল ভাষায় মানুষের সাথে মিশতে হবে। মানুষের জীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য অন্য মানুষগুলোর সম্পর্কের সাথে বেঁচে থাকে। আপনি যদি এক্সট্রাভার্ট  হয়ে থাকেন তাহলে মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করুন, সাহায্য করুন। আর যদি ইন্ট্রোভার্ট হয়ে থাকেন তাহলে বিভিন্ন ইভেন্টে যেতে পারেন। বা পশু পাখি পালার মাধ্যমেও নিজের একঘেয়েমি কাটাতে পারেন। গবেষণা মতে মানুষ যখন একঘেয়েমি অনুভব করে তখন তারা আরো বেশি ক্রিয়েটিভ হয়ে যায়।  ক্রিয়েটিভিটিও কঠিন কিছু না। এখন যুগটা এমন হাতের নাগালে সবকিছু থাকে। চাইলে কিছু রান্না করতে পারেন, সেলাই, ছবি আকা, লেখালেখি করা, পাজল মিলানো, গাছ লাগানো অপশনের অভাব নাই। 

এরপরের পয়েন্টটা হচ্ছে কৌতুহল। মানুষ জন্মগতভাবেই কৌতুহলী। একঘেয়েমি কাটানোর এটা সবচেয়ে বেস্ট হাতিয়ার। যে কোনো কিছুর মধ্যে কৌতুহলী হতে পারেন। ধরুন আপনি চিন্তা করলেন ঢাকা শহরে এত যানজট কেন এটা নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করি। আপনি যত ঘাটবেন তত জানবেন, তত সমস্যা দেখবেন আবার সমাধানও দেখবেন৷ মানুষের ভেতরের জানার ইচ্ছা, কৌতুহল এসব আদিম গুণ। তাই জানার প্রসেসে আপনার ব্রেইন আপনাকে এত পরিমাণে ডোপামিন দিবে যে আপনার একঘেয়েমি কখন কেটে গেছে টেরও পাবেন না। সত্যি বলতে একঘেয়েমি আসলে খারাপ কিছু না। এটা একটা মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক ব্যাপারই। অথচ আমরা একঘেয়ে অনুভব করার সাথে সাথেই সেটা কাটানোর জন্য ফোনে,ল্যাপটপে স্ক্রলিং করা শুরু করি। সেটা বরং ভয়ংকর ব্যাপার। এভাবে নিজেকে জানার,  ভেতরের ক্রিয়েটিভিটিকে বের করে আনার পথ দিন দিন নিজের হাতেই শেষ করে দিচ্ছে মানুষ। সো নেক্সট টাইম যখন একঘেয়ে লাগবে, ক্রিয়েটিভ কিছু ভাবুন বা করুন। যেটাতে সত্যিকার অর্থে আপনার জীবনের অর্থ খুজে পাবেন। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top