বর্তমানে ডেঙ্গু আবারও ফিরেছে আতঙ্ক হয়ে। মশার প্রকোপ বেড়েছে এতটা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে যে কোনো মহামারী থেকে কম কিছু বললে ভুল হবে।
এমনও হয়েছে একদিনে সবোর্চ্চ ৭০৫ জন মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে। ডেঙ্গু কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে গেছে একটা পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝাই। এ বছরে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৯৬৯ জনে। ৩৬৬ জনের প্রাণ গেল এইডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে। যেটা ২০২৪ সালের সাথে তুলনা করলে সংক্রমণ বেড়েছে প্রায় ৮৩%। আর মানুষের মৃত্যুর হার গত বছরের তুলনায় এ বছর ৪৩% বেশি। শুধু নভেম্বর মাসেই সবোর্চ্চ ৮৮ জন মারা গেলো ডেঙ্গুতে আর আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১ হাজার ১০৭ জন। তবে আগের বছর গুলোর সাথে এ বছরে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। সেটা হচ্ছে আগের বছর বেশির ভাগ ডেংগুর কেসগুলো ছিল শহর কেন্দ্রিক। তবে এবার ব্যাপারটা ভিন্ন মোড় নিয়েছে। কারণ বেশির ভাগ ডেংগুর কেস এসেছে মূল শহরের বাইরের মফস্বল বা গ্রাম থেকে। মফস্বল আর গ্রামেরও এখন নগরায়ন হচ্ছে বলে কথা। মানুষ বাড়ছে সাথে ঘরবাড়ি। এই ঘনবসতিপূর্ণ জায়গাগুলোর মানুষের থাকার চলার জায়গাই এতটা সংকীর্ণ যে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করার জন্য আলাদা করে চিন্তা করার সুযোগটাই বেশ কম। অথচ এই মানুষগুলোই ভোগে সবচেয়ে বেশি। সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমগুলোও প্রায়ই এসব জায়গা পর্যন্ত পৌঁছায় না।
খেয়াল করলে দেখবেন এই বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মাঝে যারা মারা গেছে তাদের বেশির ভাগের বয়স কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো ১৮৭ জনের মধ্যে ৯৪ জনেরই বয়স ৩০ বছরের নিচে। খুজে দেখা গেল বেশির ভাগ মৃত্যুগুলো হচ্ছে শক সিন্ড্রোমের কারণে। মানে রোগের শুরুতেই রক্ত পরীক্ষা বা চিকিৎসা না করানোর কারণে অনেক সময় চলে যায় ডেঙ্গুর ব্যাপারটা ধরতেই। ততক্ষনে রোগীর অবস্থা এতটা জটিল হয়ে যায় যে বাচানো সম্ভব হয় না। এর মাঝে ১৬-৩০ বছর বয়সী মানুষগুলো শারীরিক শক্তি সামর্থ্যের কারণে অসুস্থ হলেও ভাবে সেরে যাবে কয়েকদিনের মাঝে। ডাক্তার, হসপাতালের ঝাক্কি ঝামেলার কি প্রয়োজন। এই চিন্তার কারণেই প্রাইমারি লেভেলে অনেকের ডেঙ্গু ধরাই পড়ে না। তাই ৩০ বছরের নিচের মানুষ মারা যাচ্ছে বেশি। আবার যাদের আগ থেকেই বিভিন্ন অসুস্থতা আছে তাদেরকেও ডেঙ্গু সহজেই কাবু করে ফেলছে। তাই বয়স যাই হোক না কেন জ্বর আসলে বা ডেঙ্গুর যে কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই দেরি না করে হাসপাতালে যাওয়া উচিত, রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত।
কথা হচ্ছে দিনকে দিন ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ছে কেন?
ক্লাইমেট চেইঞ্জ নিয়ে আগেও বলেছিলাম। আবহাওয়ার পরিবর্তনে যে শুধু সিজনের সময়কালে এদিক সেদিক হচ্ছে তা না। স্বাভাবিক গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকালের হেরফেরের সাথে প্রাকৃতিকভাবেই মশার বংশবিস্তার করার সময় আগের থেকে বেড়ে গেছে। একটা সময় কেবল বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ে মানুষ চিন্তায় থাকত। কিন্তু এখন আর কোনো মৌসুমের বাধা ধরা নেই। বছরের যে কোনো সময় হতে পারে ডেঙ্গু। সাথে অসচেতনতার নামে এডিস মশা জন্মানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে মানুষ নিজেই। খাল, বিল, ডোবা ভরাট করে একের পর এক বিল্ডিং তুলছে। অথচ পরিবেশ নিয়ে এতটুকু মাথাব্যাথা নেই কারো। মানুষ শুধু বাহ্যিক সমস্যাটাই চোখে দেখছে কিন্তু একদম রুটের সমস্যাটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতেই রাজি না।
বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার বাজেট তো হয়। কিন্তু কাজের বেলায় একদম জিরো। কারণ কোটি টাকা খরচ করে বেশির ভাগই অকার্যকর ঔষধ কেনা হয় যেগুলো দিয়ে ঠিকমত ২০% মশাও মরে কিনা সন্দেহ। সিটি করপোরেশন থেকে মশার লার্ভা নিধনে স্প্রে মেশিন দিয়ে ছিটানো হয় কীটনাশক লার্ভিসাইড আর পূর্ণবয়স্ক বা উড়ন্ত মশা নিধনে ফগার মেশিন দিয়ে ছিটানো হয় অ্যাডাল্টিসাইড। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের ব্যবহার করা অ্যাডাল্টিসাইড ফগার মেশিনে ছিটালে মশা মরে ২০ শতাংশের নিচে। এক লিটার পানির সঙ্গে ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত প্রয়োগমাত্রা অনুযায়ী দশমিক ১২৫ মিলিলিটার লার্ভিসাইড স্প্রে করা হলে দুই ঘণ্টায় সর্বোচ্চ মশা মারা যায় মাত্র ১৬ শতাংশ। এই ওষুধের মাত্রা যদি ১০ গুন বাড়ানো হয় তাহলে ৮৪% মশা মারা যাবার কথা কিন্তু সাথে পরিবেশের ভয়ংকর ক্ষতিও হবে।
অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই ওষুধ জাস্ট ১০ গুন না নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ৮০% বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। যেটাতে পরিবেশের তো ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে অথচ মশার যেন গায়েই লাগছে না। মশাগুলো কি তাহলে সব ওষুধ রেজিস্টেন্ট হয়ে গেল? নাকি ওষুধেই এত পরিমাণ ভেজাল যে ৮০/৯০ গুন বেশি প্রয়োগেও কোনো কাজের কাজ কিচ্ছু হচ্ছে না?
যে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রতিবছরই ভয়াবহ রুপ নেয় সে দেশে সারা বছর ঠিকমত মশা নিধন কর্মসূচির নাম গন্ধও পাওয়া যায় না। কেবল মানুষের মৃত্যুর সাথেই যা একটু তোড়জোড় চলে। না আছে পর্যাপ্ত জনবল না আছে জনসচেতনতা বাড়াতে কোনো উদ্যোগ। মাঝে মধ্যে শুধু লোক দেখানো অভিযান কার্যক্রম চলে তাও শহরাঞ্চলকে ঘিরে। এই অভিযোগ আমার ব্যক্তিগত না, এই অভিযোগ ঘরে ঘরে৷
আচ্ছা ডেঙ্গুর কি কোনো ঔষধ বা ভ্যাক্সিন নাই? আছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে এখন কথা হচ্ছে ভ্যাকসিন নিয়ে। ডেঙ্গু কিন্তু শুধু বাংলাদেশের মাথাব্যাথার কারণ না, এই টিমে আছে আফ্রিকা ও মধ্য আমেরিকার অনেক দেশও। যেখানে ডেঙ্গুর অবস্থা ভয়াবহ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন বা সিডিসি এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় চারশ কোটি মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করে। তাহলে বুঝতেই পারছেন ডেঙ্গু একটা গ্লোবাল সমস্যা। এই গ্লোবাল সমস্যার তেমন আহামরি সমাধান এখনও কেউ করতে পারে নি। তবে ডেঙ্গুর জন্য ‘ডেঙ্গাভেক্সিয়া’ এবং ‘কিউডেঙ্গা’ নামের দুটি টিকা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এখানেও একটা “কিন্তু” আছে। কারণ টিকাগুলো ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আছে অনেক মারপ্যাচ। এই যেমন ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা সব বয়সীদের দেয়া যায় না, এর জন্য বয়স হতে হবে ১৬ বছরের নিচে। আবার “ডেঙ্গাভ্যাক্সিয়া” টিকা দিতে হলে আগে একবার ডেঙ্গু হতে হবে। যার জীবনে কখনো ডেঙ্গু হয়নি তাকে এই ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না। তাছাড়াও এই দুটো টিকারই অনেক ধরনের সাইড ইফেক্টস আছে, সীমাবদ্ধতা আছে।
যেহেতু বাংলাদেশে ভ্যাক্সিনের কথা হচ্ছে সেক্ষেত্রে আরও একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। সেটা হল রাজনৈতিক পারস্পেক্টিভ। ডেঙ্গুর টিকার অনুমোদন দিতে হলে আগে ডেঙ্গুকে বাংলাদেশে মহামারী রোগ হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। আর এমনটা করলে সামনে চলে আসবে আমাদের সরকারের ব্যর্থতা। যেখানে স্পষ্ট হয়ে যাবে সাধারণ জনগণকে মশা থেকে রক্ষা করার মত ব্যাসিক ব্যাপারগুলোতেও সরকার কতটা দুর্বল। তবে শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ না, সাধারণ মানুষও এখানে একটি ইস্যু। মহামারি শব্দটা শুনলেই মানুষ আতঙ্কিত হয় বেশি। ভুল ইনফরমেশন ছড়ায়, ভয়ে ভুল স্টেপ নিয়ে ফেলে অনেকে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে আতঙ্কেই অনেকে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। তাই ডেঙ্গুর পাশে মহামারী ট্যাগটা লাগানো হবে কিনা সেটা বিশেষজ্ঞদের জন্য একটা চিন্তার বিষয়।
কি করতে হবে:
মহামারী ট্যাগ লাগুক আর না লাগুক আপাতত ডেঙ্গু থেকে বাচতে নিজেদের সচেতনতাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
বাসাবাড়ির আশপাশে খাল, নালা-নর্দমাসহ খালি জায়গা সারাবছর পরিষ্কার রাখার জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হোক। মশা নিধনে কেনা ওষুধের কার্যকারিতা যাচাই করা হোক সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে। ঘরের বাইরের মশা নিধন সিটি করপোরেশনের দ্বায়িত্ব কিন্তু ঘরের ভেতরের মশা নিয়ন্ত্রণের দ্বায়িত্ব আমাদের নিজের। নিজের ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে তাই কোনো প্রকার কম্প্রোমাইজ করা যাবে না। ঘরে বা ছাদে রাখা গাছের টব, এসির নিচে, ফ্রিজের নিচে তিন থেকে পাঁচদিনের বেশি যেন পানি জমা না থাকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিষ্কার রাখতে হবে ঘরের প্রতিটা আনাচে কানাচে। আর সেফটির জন্য মশারী মাস্ট। যতই আলসেমি লাগুক না কেনক ঘুমানোর সময় মশারি টানাতেই হবে।
আমার মতে এক্ষেত্রে মিডিয়া বেশ বড় একটা ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন বিজ্ঞাপন, ক্যাম্পেইন, জনসচেতনতামূলক টিভিসি বানিয়ে টিভিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে ডেঙ্গু নিয়ে সতর্ক করা এবং এ সময়ে কি কি করণীয় সে ব্যাপারগুলো জানাতে পারে। এভাবে জনগণের অনেক বড় অংশ নিজেদের দায়িত্বগুলো নিয়ে জানতে পারবে, ডেঙ্গু সম্পর্কে আতঙ্কিত না হয়ে ক্লিয়ার একটা ধারণা পাবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুনুর রশীদের মতে, যে বদ্ধ পানিতে মশার জন্ম হয় সেখানে মাছ ছাড়া হলে ৪০% মশা নিধন সম্ভব, পেস্টিসাইড ছিটিয়ে আরও ৪০% কমানো যাবে বাকি ২০% প্রতিরোধ করা যাবে বাসা-বাড়িতে জমে থাকা পানি আর ড্রেন পরিষ্কার রেখে। এই স্টেপ গুলো নিয়ে যদি হাজার হাজার মানুষকে মহামারী থেকে বাচানো সম্ভব হয় তবে চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? প্রতিবছর একই যুদ্ধ যদি করতেই হয় তাহলে প্রস্তুতিটা কি আরও ভালোমত নেয়া উচিত না? সামনে জলবায়ুর আরও খারাপ অবস্থার দিকে আগাচ্ছি আমরা। বিশেষজ্ঞরা বলছে হয়ত শীতের সিজনটাই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে৷ বদলে যেতে পারে গ্রীষ্ম, বর্ষার প্যাটার্ন। উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে আরও চরম আকার নিতে পারে ডেঙ্গু। প্রস্তুতিটা তাই জোরেশোরেই হোক।



