অনলাইন জুয়ার সাইকোলজিক্যাল ট্র্যাপ

কেমন হবে যদি ঘরে বসেই লক্ষ লক্ষ টাকা আপনার পকেটে চলে আসে? কোনো কষ্ট ছাড়াই? কিংবা আপনার হাতের ২০ টাকা যদি ১০ গুণ বাড়িয়ে ২০০ টাকা ফেরত দেয়া হয় আপনাকে? কি? নেবেন? এমন অফার তো  স্বয়ং পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি জেফ বেজোসের মত মানুষও লুফে নেবে। কিন্তু পরিশ্রম ছাড়া আসলে কি কিছু মিলে এই দুনিয়ায়?  

ইউটিউবে কোনো ভিডিও দেখার সময় কিংবা ফেইসবুকে স্ক্রলিং করতে গিয়ে এখন প্রায় সময়ই সামনে আসে এক ধরনের বিজ্ঞাপন। গেম খেলে জিতে নিন লক্ষ টাকা। এক টাকাকে কয়েক সেকেন্ডে লাখ টাকার করার প্রতিজ্ঞা কেবল জুয়ার টেবিলেই সম্ভব। এক সময় রাস্তা থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁয় যে জুয়ার আসর বসত সশরীরে তা এখন শিফট হয়ে চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। বলছি ডিজিটাল যুগের ডার্ক সাইড অনলাইন জুয়ার কথা। অনলাইন জুয়ার চটকদার বিজ্ঞাপন আপনাকে স্বপ্ন দেখাবে খুব অল্প টাকা বাজি লাগিয়ে কিভাবে আপনি রাতারাতি বনে যেতে পারবেন মিলিয়নার৷ এ রঙিন ধোকায় একবার যে পা দিয়েছে তার বেচে থাকা এতটাই বিষাক্ত হয়ে গেছে তারচেয়ে যেন মৃত্যু সহজ। 

পরিণতিটা যখন জানা তাহলে এত এত মানুষ কেন জড়াচ্ছে অনলাইনের জুয়ায়? কিভাবে জড়াচ্ছে? এর শেষই বা কোথায়? 

সুন্দর একটি আধাপাকা বাড়ি, মোটরসাইকেলের শোরুম সব মিলিয়ে বেশ ভালো চলছিল কুষ্টিয়ার সাগর হোসেনের। বছরের পর বছরের পরিশ্রম করে যে সম্পদ গড়ে তুলেছিল সেটা তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়তে সময় লাগে নি এক বছরও। দ্রুত টাকা বাড়ানোর চক্করে পা দিল অনলাইন জুয়ার জগতে। এরপরেই হারাল যা ছিল তাও। ২১ লাখ টাকায় বাড়ি, ১৫ লাখ টাকায় শোরুম বিক্রি করল। তাতেও রেহাই পেল না৷  আরও বাকি ৩ লাখ টাকা৷ রাতারাতি কোটিপতি হবার স্বপ্নে জুয়ার জালে পা দিয়ে একসময়ের স্বচ্ছল সাগর হোসেন এখন রীতিমতো পথের ফকির। 

এক জন দুই জন নয়। সাগর হোসেনের মত দেশের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এখন অনলাইন জুয়ার নেশায় আসক্ত।  এই নেশার কাছে যেন হার মানবে সিগারেট বা মদের নেশা। অনলাইন জুয়ার শুরুটা হয় বিজ্ঞাপন দেখে কৌতুহল বশত কিংবা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে। মূলত অল্প কিছু টাকা ইনভেস্ট করে লাখ টাকা পাবার আশায় মানুষ ঢোকে অনলাইন জুয়ার জগতে। জুয়ার সাইটগুলো মানুষের আকর্ষণ পাবার জন্য প্রথমেই কিছু টাকা বোনাস দেয়। বিশ্বাস পাবার জন্য কিছু বাজি জিতিয়েও দেয়৷ মানুষ জিতে যাবার পর সংকোচ কেটে যায়। জেতার লোভে আরও টাকা ঢালে। প্রথমে ৫০০ তারপর হাজার খানেক টাকা তারপর লাখখানেক। কিন্তু একবার কাউকে আসক্ত করাতে পারলে ভোজবাজির মত পালটে যায় দৃশ্য। একের পর এক হারতে থাকে জুয়াড়ি। কিন্তু আর ফিরতে পারছে না এসব থেকে কারণ ততদিনে যে নেশা হয়ে গেছে জুয়ার।  

সাইকোলজি

সব হারাচ্ছে দেখেও কেন জুয়ার নেশা ছাড়ানো এত কঠিন? ঠিক এইখানে মানুষের সাইকোলজিটা অদ্ভুত। প্রথমত অনলাইন বেটিং সাইটগুলায় সে মানুষই ঢোকে যাদের মাথায় কাজ করে দ্রুত বড়লোক হবার চিন্তা। বেশির ভাগ অস্বচ্ছল মানুষ অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অল্প টাকাকে কয়েক গুন বাড়াতে চায়।  এর উপর আছে নানারকম খেলায় বাজি লাগানোর সুযোগ। 

আইপিএল থেকে শুরু করে, বিপিএল, সিপিএল, ফুটবলের বিভিন্ন টুর্নামেন্টেও অনলাইন বেট লাগানো যায়। হিউম্যান‌ সাইকোলজির কারনে জুয়ারিদের একটা বড় অংশ‌ ধরে নেয় যেটি বড় দল‌ তারাই জিতবে। কিন্তু খেলায় শুধু বড় দল‌ই জিতে না। হারজিতের চান্স দুই দলেরই ৫০/৫০ থাকে। বাজিতে যে জিতে সে দ্বিগুণ উৎসাহে আরও বেশি টাকা লাগায় জুয়ায় আর যে হেরে যাগ তার মাথায় চেপে যায় হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার জিদ। হারানো টাকা ফিরে পেতে আরও বেশি টাকা বিনিয়োগ করে। একের পর এক সব টাকা হারাতে থাকলেও তারা মনে করতে থাকে এরপরেরটায় হয়ত জিতে যাব। ভাগ্যের খেলা মনে করে সৌভাগ্যের আশায় একের পর এক বাজি হারতে থাকা মানুষটা জানে না আসলে পুরো জুয়ার সিস্টেমটাই এমন ভাবে সাজানো থাকে যেন একটা সময় বেশির ভাগ দানে হেরে যায় জুয়াড়ি।আর তার বিশাল অংশের লাভটা চলে যায় কোম্পানির কাছে। জুয়ায় একটা জ্যাকপট পেয়ে বিশাল অংকের টাকা পাওয়ার আশায় থাকা মানুষ একসময় বাস্তবতা বোঝে। কিন্তু ততদিনে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে তারা। 

অনলাইন/অফলাইন জুয়া

একসময় অফলাইন জুয়ার চল ছিল। তখন বড়লোকেরা ক্লাবে আর গরিবরা লুডু, ক্যারাম বা দোকানে বসে খেলায় বাজি লাগাতো। অফলাইন জুয়া, ক্যাসিনো কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ হবার পর,  অনলাইন জুয়ার জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে।  এখন স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সহজেই পাওয়ার কারণে বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই রাস্তা, দোকান বা বাসায় বসে মোবাইল থেকে অনলাইনে জুয়া খেলতে পারে সহজেই। জুয়ার আলাদা এ্যাপ বা ওয়েবসাইটে ২৪ ঘন্টাই জুয়া খেলা যায়।  জুয়ার এ সাইটগুলো মূলত চালানো হয় দুবাই, সাইপ্রাস চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়ার মত দেশ থেকে। আর জুয়ার পুরো স্পাইডার ওয়েব কন্ট্রোল করে দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো এজেন্ট। এদের কাজ হচ্ছে মানুষকে ফুসলে ফাসলে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত করানো। আর জুয়াড়িদের টাকা অবৈধ উপায়ে বাইরের দেশে থাকা তাদের হেডকোয়ার্টারে পাঠানো। জুয়াড়িদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং এর সাহায্যে টাকা নিয়ে সে টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা হয় বিদেশে। এক একজন এজেন্টের ব্যাংক একাউন্টে দৈনিক কোটি টাকার লেনদেন হয়। এজেন্টদের অল্প সময়ে কোনো পুজি ছাড়াই বিশাল বাড়ি, বিলাসবহুল জীবন দেখে অনেকেই ফাদে পড়ে যায় এই স্ক্যামের। 

পাড়ার বখে যাওয়া যুবক থেকে মিডিয়ার সেলেব্রেটি কেউ বাদ যাচ্ছে না এর ভয়ংকর থাবা থেকে। মিডিয়ার অভিনেত্রী হুমাইরা হিমুর মৃত্যুর পেছনেও অনলাইন জুয়ার হাত আছে বলে ধারণা করা হয়৷ তিনি প্রায় ৩০ লাখ টাকা হারিয়ে ছিলেন জুয়া খেলে। ওয়ার্ল্ড গ্যাম্বলিং মার্কেট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে শুধু অনলাইন জুয়ার বাজারমূল্য ছিল ৬ হাজার ৩৫৩ কোটি মার্কিন ডলার। 

জুয়া শুধু একা কোনো ব্যক্তিকে নিঃস্ব করে না সাথে ধ্বংস করে তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আশেপাশের মানুষ, গোটা সমাজকেও। যে স্কুলের ছেলের টিফিনের টাকাও চাইতে হয় বাবা মায়ের কাছে। সে ছেলে জুয়া খেলে হাজার হাজার টাকা লস খেয়ে বাবা মায়ের উপর অত্যাচার করে আরও টাকার জন্য। জুয়ার নেশায় টাকা জোগাড় করতে টাকার জন্য চাপ দেয়া,  না দিলে মারধর, চুরি এমনকি খুনের শিকার হতে হয় পরিবারকে। জমানো টাকা খেলায় লাগিয়ে, বাপ দাদার ভিটা বাড়ি বিক্রি করে অনেক পুরুষ নিজের সাথে ডুবাচ্ছে পরিবারের ভবিষ্যৎও৷ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি জুয়ার মত মরণ খেলায় নৈতিকতা হারায় তাহলে সমাজ কিভাবে ভালো থাকবে? 

আরও আফসোস হয় যখন বেশির ভাগ যুবকদের আইডল সেলেব্রেটিরা এমন জীবন ধ্বংস করা জুয়ার প্রমোশন করে৷  যেমন কদিন আগে সাকিব আল হাসান এমন একটি অনলাইন জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপনের প্রচারণা করে নেটিজেনদের কাছে নিজের সুনাম হারিয়েছে। এসব ভুয়া আইডলদের ফলো করতে গিয়ে নিজের সব হারাচ্ছে এক শ্রেণির মানুষ। যারা বোঝে না আইডলদের অনুকরণ করা কোথায় গিয়ে থামাতে হবে। 

সমাজের মরণব্যাধির হাত থেকে তাহলে কিভাবে বাচতে পারে মানুষ?  কোনো আইন কি নেই সুরক্ষা দেয়ার জন্য? তা আছে। কিন্তু সে আইন ১৫৬ বছর পুরানো। ব্রিটিশ আমলে পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট ১৮৬৭, সেকশন ৩ অনুযায়ী, যে কোনও ঘর, স্থান বা তাঁবু জুয়ার আসর হিসেবে ব্যবহৃত হলে তার মালিক বা রক্ষণাবেক্ষণকারী, জুয়ার ব্যবস্থাপক বা এতে কোনও সাহায্যকারী তিন মাসের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

অর্থাৎ আইনটি সশরীরে উপস্থিত জুয়ার জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু ডিজিটাল যুগের কি আর সেকেলে আইন চলে? ২০২৫ সালে পাশ হয়েছে নতুন সাইবার সিকিউরিটি আইন যেখানে অনলাইন জুয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই সাথে অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোম্পানিগুলোকে শাস্তি দেওয়া এবং ব্যাটিং সাইটগুলোকে নিষিদ্ধ করার ঘোষনা দেওয়া হয়েছে। 

এই আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে বিকাশ, নগদের মত বেটিং কোম্পানির টাকা লেনদেনে দুইবার চিন্তা করবে। কারণ পরোক্ষভাবে সাহায্যের দায়ে শাস্তি পেতে হবে এই এমএফএস কোম্পানিগুলোরও। 

তবে অনলাইনের জগত একটা সমুদ্রের মত এটা মানতেই হবে। এ পর্যন্ত প্রায় অনলাইন জুয়ার প্রায় তিন হাজার সাইট বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু একটা বন্ধ হতেই আবার ভিন্ন নামে আরও দশটা সাইট খুলে বসে কোম্পানিগুলো।  এটার উপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আইনের সাথে মানুষের মধ্যেও বেশি বেশি সচেতনতা জাগানো খুবই প্রয়োজন।  কারণ দেশের মানুষ বাচলেই বাচবে দেশ। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top